সেভেন সিস্টার কি? সেভেন সিস্টার্স মনে রাখার কৌশল
সেভেন সিস্টার্সের নাম শোনেনি এমন লোক খুব কমই আছে। ভারতের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ৭ টি রাজ্য নিয়েই হচ্ছে এই সেভেন সিস্টার্স। প্রায় প্রায়ই এই সেভেন সিস্টার্স আলোচনায় উঠে আসে। আর পরীক্ষার কথা তো বলার বাইরে। বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি চাকরির পরীক্ষায় সেভেন সিস্টার্স থেকে প্রশ্ন আসবেনা তা ভাবাই যায় না।
তবে অনেকেই এই সেভেন সিস্টার্স মনে রাখতে পারেন না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই কৌশল অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, এটি সম্পর্কে খুব ভালো ভাবে জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, শর্ট টেকনিকের মাধ্যমে মুখস্ত করতে হবে। তো আজ আমরা জানবো যে সেভেন সিস্টার্স কি এবং সেভেন সিস্টার্স মনে রাখার কৌশল।
আরও পড়ুনঃ উল্কা বৃষ্টি কাকে বলে?
সেভেন সিস্টার কি?
সেভেন সিস্টার্স হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত নাম। এদেরকে কেন সেভেন সিস্টার্স বলা হয় তা জানেন কি? আসলে এই রাজ্যগুলো ভৌগোলিকভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এদের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এই রাজ্যগুলি হলো অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা।
এগুলো একে অপরের সাথে এমনভাবে সংযুক্ত যে এদের ৭ টি বোনের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তবে, এই নামকরণ করা হয়েছে বেশ আগে যেগুলো আমরা পর্যায়ক্রমে জানবো আমাদের পরবর্তী আলোচনায়। এখন আমরা প্রতিটি রাজ্য সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করবো।
- আসাম সেভেন সিস্টার্সের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রাজ্য। ব্রহ্মপুত্র নদ এ রাজ্যের প্রাণ এবং এ অঞ্চলের কৃষি ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। আসাম বিশেষভাবে বিখ্যাত তার চা উৎপাদনের জন্য, যা সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। এছাড়া এখানে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে বিহু উৎসব ও আসামীয়া ভাষা আসামের বিশেষ পরিচিতি বহন করে।
- মণিপুর “জুয়েল অফ ইন্ডিয়া” নামে খ্যাত। এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি রাজ্য। লোকটাক হ্রদ এখানে অবস্থিত, যা ভাসমান দ্বীপ বা “ফুমদি”র জন্য বিখ্যাত। মণিপুরি নৃত্য ভারতের শাস্ত্রীয় নৃত্যের অন্যতম একটি ধারা, যা এ রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গর্ব।
- মেঘালয় শব্দের অর্থ “মেঘের আবাস”। এ রাজ্যের রাজধানী শিলং, যাকে বলা হয় “পূর্বের স্কটল্যান্ড”। মেঘালয় পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটি, বিশেষ করে চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম প্রচুর বৃষ্টির জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে। খাসি, গারো ও জয়ন্তিয়া উপজাতিরা এখানে বসবাস করে এবং তাদের সংস্কৃতি এ রাজ্যকে আলাদা বৈচিত্র্য দিয়েছে।
- মিজোরাম নামের অর্থ “পাহাড়ি মানুষের দেশ”। রাজধানী আইজল। এটি বাঁশ ও বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং মিজো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, সংগীত ও নৃত্যের জন্য পরিচিত। পাহাড়ি সৌন্দর্য মিজোরামকে পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় করেছে।
- নাগাল্যান্ড হলো নাগা উপজাতির আবাসস্থল। এর রাজধানী কোহিমা। এ রাজ্য সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য প্রসিদ্ধ। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত “হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল” নাগাল্যান্ডের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, যেখানে বিভিন্ন উপজাতির ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, সংগীত ও রীতিনীতি প্রদর্শিত হয়। পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও এই রাজ্যের অন্যতম সম্পদ।
- ত্রিপুরা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। রাজধানী আগরতলা। এটি আনারস, বাঁশ এবং হস্তশিল্প উৎপাদনের জন্য পরিচিত। ত্রিপুরার সংস্কৃতি নৃত্য ও সংগীতে সমৃদ্ধ, যা এখানকার মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সেভেন সিস্টার্স উৎপত্তি কিভাবে হয়?
“সেভেন সিস্টার্স” নামটির উৎপত্তি ঘটে ১৯৭২ সালে। সেই সময় ত্রিপুরার সাংবাদিক জ্যোতি প্রসাদ সাইকিয়া একটি রেডিও আলোচনায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে একত্রে “Seven Sisters” নামে আখ্যায়িত করেন। রাজ্যগুলো হলো অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা। পরবর্তীতে সাইকিয়া এই অঞ্চল নিয়ে ‘Land of Seven Sisters’ নামে একটি বই রচনা করেন। তাঁর এ উদ্যোগের মাধ্যমেই নামটি জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং আজও এই সাতটি রাজ্যকে একসাথে বোঝাতে “সেভেন সিস্টার্স” বলা হয়।
সেভেন সিস্টার্স কী কাজ করে?
সেভেন সিস্টার্সের এই সাতটি রাজ্যের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন দিক দিয়ে এগুলোর গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। আর এগুলো শুধু ভারতের জন্য নয়, ভারতের প্রতিবেশি দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
- এই অঞ্চল ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন এবং কেবলমাত্র শিলিগুড়ি করিডোরের মাধ্যমে যুক্ত। ভৌগোলিকভাবে এটি অত্যন্ত কৌশলগত, কারণ এর সীমান্ত চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
- এখানে বসবাসরত অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায় এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রতিটি রাজ্য তাদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সযত্নে লালন করে।
- তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, বনজ সম্পদ, চা শিল্প এবং স্থানীয় হস্তশিল্প দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
- ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং জাতিগত বৈচিত্র্যের কারণে এই অঞ্চল ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায়ই গুরুত্ব পায় এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এক বিশেষ অবস্থান দখল করে আছে।
সেভেন সিস্টার্স মনে রাখার কৌশলঃ

সেভেন সিস্টার্স বা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য মনে রাখার একটি সহজ উপায় হলো তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করা। এই রাজ্যগুলোর নাম হলো অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা। এ ধরনের সংক্ষেপণ শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে, প্রতিটি রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে এগুলো আরও ভালোভাবে মনে রাখা সম্ভব।
- আ আসাম (গোয়াহাটি)
- মি মিজরাম (আইজল)
- অ অরুনাচল (ইন্দিরাগিরি)
- মে মেঘালয় (শিলং)
- ত্রি ত্রিপুরা (আগরতলা)
- ম মনিপুর (ইম্ফল)
- না নাগাল্যান্ড (কোহিমা)
এইসব গুলোকে আপনি মাত্র একটি বাক্য দিয়ে মনে রাখতে পারবেন, সেটি হচ্ছে ‘আমি অমেত্রি মনা’। খেয়াল করে দেখুন এই একটি বাক্যের মধ্যে উপরের সব কয়টি শব্দের প্রথম অক্ষর রয়েছে এবং সেগুলো সাজিয়ে লেখা। সাজিয়ে লিখলে মনে থাকার সম্ভাবনা থাকে বেশি, তাই এটিকে এভাবেই লেখা হয়।
FAQs
সেভেন সিস্টার্স এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কেমন?
সেভেন সিস্টার্স অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আসাম তেল, গ্যাস ও চা উৎপাদনের জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলের বনজ সম্পদ, বিশেষ করে বাঁশ ও কাঠ, শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করে। মণিপুর, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডের হস্তশিল্প ও তাঁতজাত পণ্য দেশি-বিদেশি বাজারে সমাদৃত। এছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে পর্যটন খাত থেকে উল্লেখযোগ্য আয় হয়। সীমান্তবর্তী অবস্থান এই অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সেভেন সিস্টার্স এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কেমন?
সাতটি রাজ্য ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে শিলিগুড়ি করিডোর বা “চিকেন নেক” নামে পরিচিত একটি সরু অঞ্চলের মাধ্যমে সংযুক্ত, যা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থানের কারণে সেভেন সিস্টার্স সীমান্তরক্ষার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ এদের চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে।
